May 21, 2024, 2:01 pm
শিরোনাম
জাবিতে কুরআনের অনুবাদ পাঠ প্রতিযোগিতার পুরুষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে দেশটা: বিএনপি মহাসচিব ‘চ্যারিটি ফান্ড কেইউ’ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু পবিপ্রবিতে বিশ্বকবির ১৬৩ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন একজন আইনজীবীর প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করা : অ্যাটর্নি জেনারেল জাবিতে ছাত্রলীগ সম্পাদকের বান্ধবীকে নিয়োগ দিতে তোড়জোড় যুক্তিতর্ক দেখে সবাই ভাবতো ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছি : শাহ মনজুরুল হক ইবিতে মুজিব মুর‍্যালে এ্যাটর্নি জেনারেলের শ্রদ্ধা নিবেদন  বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্বের সাথে জনগণের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে : আইজিপি ইবি অধ্যাপক ড. ইকবাল হোসাইনের আত্মার মাগফিরাতে দোয়া মাহফিল

মহামারীর ভয়াল থাবায় আরেক মহামারী

সিফাত জামান মেঘলা 
  • প্রকাশের সময় : Monday, May 3, 2021,
  • 1 বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
গত এক বছর আমরা ভীষণ কঠিন সময় পার করছি।আগে হয়ত আমরা দাদা-নানাদের কিংবা বাবা মায়ের মুখে শুনেছি মহামারী কেমন হয়!
কিভাবে বাড়ির পর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম সাফা করে দেয় মহামারী।
মানুষ তখন প্রকৃতির কাছে নির্বাক।
অসহায় তার দৃষ্টি। চোখে মুখে আতংক। মনের ভিতর অজানা ভয়।
কিন্তু আজ আমরা সবাই সেই মহামারীর সাক্ষী। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কত প্রাণ ঝরে যাচ্ছি। হারিয়ে যাচ্ছে আপনজন,প্রিয়জন।
আমরা শুধু নীরবে চেয়ে দেখছি।আর পৃথিবী সুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করছি সৃষ্টিকর্তার কাছে।
সেই মহামারী করোনার জন্য গত এক বছর যাবৎ আমাদের পৃথিবীর স্থবীর।
আমরা সবাই ঘরে বন্দী।আমাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যহত হচ্ছে।
কিন্ত সেই মহামারীতে আবার নতুন মাত্রা  যোগ করেছে কলেরা বা ডায়রিয়ার প্রোকোপ।

বরিশালের ৬ টি জেলা নদী,পুকুর ও খালের পানিতে পাওয়া গিয়েছে কলেরার জীবাণু।

রোগতত্ব,রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইসিডিডিআর) এর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বরিশালের বেশির ভাগ মানুষ গৃহস্থালির কাজে নদী-খাল ও পুকুরের পানি ব্যবহার করে।

আর যেহেতু নদী-খাল ও পুকুরের পানিতে কলেরা জীবাণু পাওয়া গেছে তাই এই অঞ্চলে ডায়রিয়ার প্রকোপ অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতি বছর এই সময়  বরিশাল অঞ্চলে ডায়রিয়া দেখা দেয়।কিন্তু এবছর ডায়রিয়া মাত্রাতিরিক্ত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কলেরা ‘ভিব্রিও কলেরা (Vibrio cholerae) ‘নামক ব্যাকটেরিয়া ঘটিত ক্ষুদ্রান্ত্রের একটি সংক্রামক রোগ। এ ব্যাধি উপসর্গবিহীন অথবা মৃদু অথবা মারাত্মক হতে পারে।  কলেরার প্রধান উপসর্গ হল ঘনঘন চাল ধোয়া পানির মত পাতলা পায়খানা। এছাড়াও থাকতে পারে পেটব্যথা, জলাভাবে শারীরিক দুর্বলতা এবং চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকলে শেষপর্যন্ত পানিশূন্যতার কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।
★রোগের কারণসমূহ সম্পাদনাঃ
সাধারণত আক্রান্ত রোগীর মলের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। সাধারত পয়ঃপ্রণালীর সুষ্ঠু ব্যবস্থার অভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির মল, খাবার ও পানির সংস্পর্শে এসে খাবার ও পানিকে দূষিত করে। পরবর্তীতে উক্ত খাবার ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে কলেরার জীবাণু সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করে আক্রান্ত করে। সাধারণত যে কোন পরিবেশেই কলেরার জীবাণু দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।
★উপসর্গ-লক্ষণ সম্পাদনাঃ
কলেরার সংক্রমণ প্রায়ই মৃদু বা উপসর্গহীন হয়ে থাকে। কিন্তু, কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর হতে পারে। ভিব্রিও কলেরা দ্বারা দূষিত খাবার পানি অথবা দূষিত খাদ্য গ্রহণের পর বার ঘণ্টা থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে কলেরার লক্ষণ প্রকাশ পায়।
★গুরুতরভাবে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে যা দেখা যায়:
*ঘনঘন চাল ধোয়া পানির মত পাতলা পায়খানা
বমি
*পায়ের শিরটান
*শরীর থেকে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে গেলে পানিশূন্যতা ও শক দেখা দিতে পারে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভাগে এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার ১৩৫ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন নয় জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৪২ জন।
এছাড়া বরগুনাতে ডায়রিয়ার প্রকোপ মহামারী আকার ধারণ করেছে।
এখানে ডায়রিয়ার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আটজনের। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি।
এছাড়া এখন ও রোগী আসছে।তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসকরা।উপকূলের পানিতে
লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে ও গৃহস্থালির কাজে নদী-খাল ও পুকুরের পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া এমন চরম আকার ধারণ করেছে।
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত বরগুনা জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ১৭০ জন। গত ২৪ ঘন্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শুধুমাত্র বরগুনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ জন। সরকারি হিসেবে অনুযায়ী এখন পর্যন্ত জেলায় মারা গেছেন ৪ জন। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ৮।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল বলেন, ‘অবস্থার অবনতি যেন না হয়, সেজন্য আমরা সচেতন করতে প্রতি উপজেলায় মাইকিং করছি। নদী, খালের পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। এ ছাড়া, স্যালাইনের সংকট যেন না হয়, সেজন্য জরুরিভাবে ঢাকায় স্যালাইন চাওয়া হয়েছে।
‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ৩৫ হাজার স্যালাইন চলে আসলে স্যালাইন সংকট কেটে যাবে,’ বলেন তিনি।
এদিকে বরগুনা ও বরিশালে আইইসিডিআর এর ছয় সদস্য বিশিষ্ট সদস্য রোগীদের মল পরীক্ষা করে কলেরা জীবাণু পেয়েছে।
আইসিডিডিআর বরিশাল অঞ্চলের ছয় জেলার মানুষকে গৃহস্থলির কাজ ও অন্যান্য কাজে নদী- খাল ও পুকুরের পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে।আর যদি ব্যবহার করা ও হয় তবে তা পানি ফিটকিরি দিয়ে বিশুদ্ধকরণ করে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
★আসুন জেনে নেই ডায়রিয়া রোধে করণীয়ঃ
ডায়রিয়া হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। পানিশূন্যতা তীব্র হলে তা বিপদজনক হতে পারে – বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য।
শরীর থেকে যতোটা লবণ ও পানি বেরিয়ে যাচ্ছে তা পূরণ করা। এজন্য রোগীকে বারে বারে খাবার স্যালাইনসহ তরল খাবার খাওয়ানো। এছাড়া যে কারণে ডায়রিয়া হয়েছে তার চিকিৎসা করা।
যতোবার পাতলা পায়খানা বা বমি হবে ততোবারই সমপরিমাণ খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ান।
রোগীকে স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে।
★শিশুদের ডায়রিয়া হলে করণীয়ঃ
শিশুর ডায়রিয়া হলে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি খাবার স্যালাইন খাওয়ান। এছাড়া শিশুদের মধ্যে নিম্নোক্ত উপসর্গগুলির দেখা গেলে সরাসরি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া হচ্ছে
২৪ ঘন্টার বেশি ডায়রিয়া হলে।
*যদি ১০২ ডিগ্রী বা তার বেশি জ্বর থাকলে।
*তলপেট বা মলদ্বারে গুরুতর ব্যাথা অনুভব করা।
*মলের সাথে যদি রক্ত বের হয়।
 *মলের রং যদি কালো হয়।
*পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে।
★প্রাপ্ত বয়স্কদের ডায়রিয়া হলে করণীয়ঃ
প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়রিয়া হলে বারে বারে খাবার স্যালাইনসহ তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। তবে নিম্নোক্ত উপসর্গগুলি দেখা গেলে সরাসরি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
*ডায়রিয়া যদি ২ দিনের বেশি থাকে।
*যদি ১০২ ডিগ্রী বা তার বেশি জ্বর থাকে।
*বার-বার বমি হলে
*২৪ ঘন্টার মধ্যে ৬ বার বা তার বেশি পায়খানা হলে।
*তলপেট বা মলদ্বারে গুরুতর
*ব্যাথা অনুভব করলে।
*মলের সাথে যদি রক্ত বের হয়। *মলের রং যদি কালো হয়।
*পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে।
★ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়
ডায়রিয়া প্রতিরোধরে জন্য নিম্নলিখিত নির্দেশাবলী মেনে চলুন:
*বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
*অধিক পরিমাণে পানি ও লবণ গ্রহণ (বিশেষত রমজান মাসে ইফতার পরবর্তী সময় হতে সাহ্‌রী পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত অন্তত ০২ (দুই) লিটার পানি পান) করুন।
*অত্যধিক গরম পরিবেশে কাজ না করা। যদি করতে হয়, সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর ঠাণ্ডা পরিবেশে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।
*আবদ্ধ পরিবেশে কাজ না করা। কাজ করার জায়গায় বাতাস চলাচল করতে পারে এরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
*ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা (যেমন- পায়খানা থেকে বের হয়ে এবং খাবার আগে হ্যান্ড ওয়াশ/ সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিয়মিত নখ কাটা, পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করা এবং নিয়মিত গোসল করা) নিশ্চিত করুন।
*অতিগরমে তৈলাক্ত ও পঁচাবাসি খাবার গ্রহণ বর্জন করুন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ হতে খাবার গ্রহণ করা হতে বিরত থাকুন।
*নিরাপদ পানি পান করুন।
*সুষম খাবার গ্রহণ করুন।
*শিশুদের জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান।
*সম্ভব হলে রোটা ভাইরাসের ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন।
*স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করুন।
*বিশেষ করে সংক্রামক রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
যদি ডাইরিয়া বা বমি শুরু হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ খাবার স্যালাইন খাওয়া শুরু করুন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
★পানিশূন্যতা কিভাবে পূরণ করা যায়ঃ
ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ লবণ ও পানি বের হয়ে যায় ফলে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দেয়। এসময় শরীরের পানিশূন্যতা রোধের জন্য নিম্ন বর্ণিত দু’টি পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারেঃ
*খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ানো।
*রোগীর বেশি পানিশূন্যতা হলে অথবা খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ানোর পরও যদি পানিশূন্যতা না কমে সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী শিরার মধ্যে (ইন্ট্রাভেনাস) স্যালাইন দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করতে হয়।
মানুষের অসচেতনতার কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে।বৈরী আবহাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়।এসময় যারা দূষিত পানি ব্যবহার করেন তারাই ডায়রিয়ারে আক্রান্ত হন।
তাছাড়া গ্রীষ্মকালে সব কিছু শুকনো থাকে বলে পুকুর বা খাল বা নদীর পানিই গৃহস্থালির কাজের সম্বল। কিন্ত এ পানি দূষিত থাকলে সহজেই ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়। আবার এসময় প্রচন্ড গরমের জন্য রাস্তার পাশের অসাস্থ্যকর শরবত বা পানীয় খেয়ে থাকেন। এ থেকে ও ডায়রিয়া হবে পারে।সবাইকে এসব ব্যপারে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।
আর সবাইকে সবার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
যারা সচেতন নাগরিক তারা নিজ দায়িত্বে অন্য মানুষদের সচেতন করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সর্বাত্মক সাহায্য করতে  হবে।
সবাই সচেতন হলেই এই মহামারী সংক্রামণ স্বাভাবিক করা সম্ভব।
সর্বোপরি, জন সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।সকল কাজে নলকূপের পানি ব্যবহার করতে হবে।ঘরে পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন রাখতে হবে।তবেই আমরা এই  ডায়রিয়ার প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে পারি।
লেখক
শিক্ষার্থী
আইন বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© প্রকাশকঃ ট্রাস্ট মিডিয়া হাউস © 2020-2023